দৈনিক আলাপন

বাজেট ও জনবল সংকটে থমকে আছে পীরগঞ্জের আধুনিক গো-প্রজনন কেন্দ্র

উদ্বোধনের পরই বন্ধ সাড়ে ১৩ কোটি টাকার বুল কাফ ইউনিট



উদ্বোধনের পরই বন্ধ সাড়ে ১৩ কোটি টাকার বুল কাফ ইউনিট

সিমেন উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের শেয়ার বৃদ্ধি করার জন্য রংপুরের পীরগঞ্জে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ‘বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিট কাম মিনিল্যাব’। এর জন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৫২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। কিন্তু খাদ্য ও বাজেট বরাদ্দের অভাবে উদ্বোধনের পর থেকে বন্ধ রয়েছে এই মিনিল্যাবটি। ফলে কোটি টাকার আধুনিক এ অবকাঠামো থেকে কোনো সুফল পাচ্ছে না রংপুর অঞ্চলের খামারি ও কৃষকরা।


উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও ভ্রূণ স্থানান্তর প্রযুক্তি বাস্তবায়ন’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৮ সালে উপজেলার লালদিঘীতে ৫ একর জমির ওপর এই মিনিল্যাবটির নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছিল। ২০২৩ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। এরপর হস্তান্তর প্রক্রিয়া শেষে সেখানে ১০টি ষাঁড় দিয়ে এর কার্যক্রম শুরু হয়। তবে মাত্র একবার সিমেন উৎপাদনের পর ২০২৪ সালের শেষ দিকে খাদ্য ও বাজেটের বরাদ্দের অভাবে ষাঁড়গুলো সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।

এরপর থেকে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে ‘বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিট কাম মিনিল্যাব’ এর কার্যক্রম। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক এই গো-প্রজনন কেন্দ্র থেকে সুফল বঞ্চিত হচ্ছেন রংপুরসহ এর আশপাশের জেলার কৃষকসহ সাধারণ খামারিরা।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিট কাম মিনিল্যাব কেন্দ্রটিতে অফিস কাম ল্যাবরেটরি, সিমেন কালেকশন সেড, বুল সেড, বুল কাফ প্যান সেড, ফিড গোডাউন ও ৩০টি আইসোলেশন সেডসহ আধুনিক নানা সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। উন্নত জাতের ষাঁড়ের বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, গবেষণা ও ভ্রূণ স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, প্রতিবছর গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজননের জন্য প্রায় দুই কোটি ডোজ সিমেন প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ৪৫ থেকে ৫০ লাখ ডোজ উৎপাদন করে। প্রজননের আনুমানিক ১০ লাখ ডোজ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়। বাকি ডোজ উৎপাদন করে বেশ কিছু বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও।

এদিকে, পীরগঞ্জেই তালিকাভুক্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার খামার রয়েছে। বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিট কাম মিনিল্যাব কেন্দ্রটি চালু থাকলে রংপুরসহ আশপাশের এলাকার গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন এবং দুধ ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে এটি বড় ভূমিকা রাখত বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এই বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিটটি চালু হলে দেশের কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রমের সুবিধা পেলে সরাসরি উপকৃত হবেন খামারি ও কৃষকরা। উপজেলার প্রজাপাড়া এলাকার বিপুল সাহা, শানেরহাটের নুরনবী মণ্ডল ও ধনশলা গ্রামের খামারি চম্পা বেগমসহ একাধিক খামারি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে এই কেন্দ্রটি নির্মাণ করেছে। কিন্তু আমরা খামারিরা এর কোন সুফল পাচ্ছি না। এটি দ্রুত চালু করা উচিত। কারণ নির্মিত এই সরকারি সম্পদটি বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকলে নষ্ট হবে।

এ বিষয়ে রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মুহ. নাজমুল হুদা বলেন, মিনিল্যাবটি স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল উর্বর ও উচ্চ উৎপাদনশীল মাংস ও দুধ জাতের ষাঁড়ের বীজ উৎপদনের লক্ষ্যে ব্রিডিং বুল তৈরির জন্য ষাঁড় বাছুর সংগ্রহ করে প্রতিপালন ও গবেষণা করা। এটি বাস্তবায়ন হলে এই সকল ষাঁড় থেকে উৎপাদিত বীজের মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ, আত্মকর্মসংস্থান, জাত উন্নয়নের মাধ্যমে দেশে দুধ ও মাংসের চাহিদা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরও জানান, দেশে প্রতিবছর গরুর কৃত্রিম প্রজননের জন্য প্রায় দুই কোটি ডোজ সিমেন প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর উৎপাদন করে প্রায় ৫০ লাখ, প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় ১০ লাখ, বাকি চাহিদা পূরণ হয় বিভিন্ন বেসরকারি উৎস থেকে। এই বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিটটি চালু হলে দেশের কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রমের সুবিধা পেলে সরাসরি উপকৃত হবে কৃষক ও খামারিরা।

কৃত্রিম প্রজনন রংপুরের উপ-পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, মূলত দানাদার খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ না থাকা এবং জনবল সংকটের কারণে ইউনিটটি সাময়িক বন্ধ রয়েছে। বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলেই এটি পুনরায় চালুর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (কৃত্রিম প্রজনন) ডা. ফরিদা ইয়াছমিন জানান, বাজেটে অর্থ বরাদ্দ ও জনশক্তি স্বল্পতার কারণে বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিটটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। বরাদ্দ পেলে দ্রুত চালুর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।


আপনার মতামত লিখুন

 দৈনিক আলাপন

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬


উদ্বোধনের পরই বন্ধ সাড়ে ১৩ কোটি টাকার বুল কাফ ইউনিট

প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সিমেন উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের শেয়ার বৃদ্ধি করার জন্য রংপুরের পীরগঞ্জে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ‘বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিট কাম মিনিল্যাব’। এর জন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৫২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। কিন্তু খাদ্য ও বাজেট বরাদ্দের অভাবে উদ্বোধনের পর থেকে বন্ধ রয়েছে এই মিনিল্যাবটি। ফলে কোটি টাকার আধুনিক এ অবকাঠামো থেকে কোনো সুফল পাচ্ছে না রংপুর অঞ্চলের খামারি ও কৃষকরা।


উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও ভ্রূণ স্থানান্তর প্রযুক্তি বাস্তবায়ন’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৮ সালে উপজেলার লালদিঘীতে ৫ একর জমির ওপর এই মিনিল্যাবটির নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছিল। ২০২৩ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। এরপর হস্তান্তর প্রক্রিয়া শেষে সেখানে ১০টি ষাঁড় দিয়ে এর কার্যক্রম শুরু হয়। তবে মাত্র একবার সিমেন উৎপাদনের পর ২০২৪ সালের শেষ দিকে খাদ্য ও বাজেটের বরাদ্দের অভাবে ষাঁড়গুলো সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।

এরপর থেকে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে ‘বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিট কাম মিনিল্যাব’ এর কার্যক্রম। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক এই গো-প্রজনন কেন্দ্র থেকে সুফল বঞ্চিত হচ্ছেন রংপুরসহ এর আশপাশের জেলার কৃষকসহ সাধারণ খামারিরা।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিট কাম মিনিল্যাব কেন্দ্রটিতে অফিস কাম ল্যাবরেটরি, সিমেন কালেকশন সেড, বুল সেড, বুল কাফ প্যান সেড, ফিড গোডাউন ও ৩০টি আইসোলেশন সেডসহ আধুনিক নানা সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। উন্নত জাতের ষাঁড়ের বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, গবেষণা ও ভ্রূণ স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, প্রতিবছর গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজননের জন্য প্রায় দুই কোটি ডোজ সিমেন প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ৪৫ থেকে ৫০ লাখ ডোজ উৎপাদন করে। প্রজননের আনুমানিক ১০ লাখ ডোজ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়। বাকি ডোজ উৎপাদন করে বেশ কিছু বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও।

এদিকে, পীরগঞ্জেই তালিকাভুক্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার খামার রয়েছে। বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিট কাম মিনিল্যাব কেন্দ্রটি চালু থাকলে রংপুরসহ আশপাশের এলাকার গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন এবং দুধ ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে এটি বড় ভূমিকা রাখত বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এই বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিটটি চালু হলে দেশের কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রমের সুবিধা পেলে সরাসরি উপকৃত হবেন খামারি ও কৃষকরা। উপজেলার প্রজাপাড়া এলাকার বিপুল সাহা, শানেরহাটের নুরনবী মণ্ডল ও ধনশলা গ্রামের খামারি চম্পা বেগমসহ একাধিক খামারি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে এই কেন্দ্রটি নির্মাণ করেছে। কিন্তু আমরা খামারিরা এর কোন সুফল পাচ্ছি না। এটি দ্রুত চালু করা উচিত। কারণ নির্মিত এই সরকারি সম্পদটি বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকলে নষ্ট হবে।

এ বিষয়ে রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মুহ. নাজমুল হুদা বলেন, মিনিল্যাবটি স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল উর্বর ও উচ্চ উৎপাদনশীল মাংস ও দুধ জাতের ষাঁড়ের বীজ উৎপদনের লক্ষ্যে ব্রিডিং বুল তৈরির জন্য ষাঁড় বাছুর সংগ্রহ করে প্রতিপালন ও গবেষণা করা। এটি বাস্তবায়ন হলে এই সকল ষাঁড় থেকে উৎপাদিত বীজের মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ, আত্মকর্মসংস্থান, জাত উন্নয়নের মাধ্যমে দেশে দুধ ও মাংসের চাহিদা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরও জানান, দেশে প্রতিবছর গরুর কৃত্রিম প্রজননের জন্য প্রায় দুই কোটি ডোজ সিমেন প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর উৎপাদন করে প্রায় ৫০ লাখ, প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় ১০ লাখ, বাকি চাহিদা পূরণ হয় বিভিন্ন বেসরকারি উৎস থেকে। এই বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিটটি চালু হলে দেশের কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রমের সুবিধা পেলে সরাসরি উপকৃত হবে কৃষক ও খামারিরা।

কৃত্রিম প্রজনন রংপুরের উপ-পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, মূলত দানাদার খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ না থাকা এবং জনবল সংকটের কারণে ইউনিটটি সাময়িক বন্ধ রয়েছে। বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলেই এটি পুনরায় চালুর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (কৃত্রিম প্রজনন) ডা. ফরিদা ইয়াছমিন জানান, বাজেটে অর্থ বরাদ্দ ও জনশক্তি স্বল্পতার কারণে বুল কাফ রিয়ারিং ইউনিটটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। বরাদ্দ পেলে দ্রুত চালুর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।



 দৈনিক আলাপন

সম্পাদক ও প্রকাশক: আমিনুল হক
নির্বাহী সম্পাদক: কাজী জাহিদ
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ নুরুন্নবী।

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
উদ্বোধনের পরই বন্ধ সাড়ে ১৩ কোটি টাকার বুল কাফ ইউনিট
0:00 / 0:00
1x